লেপ সবসময়ে লাল কাপড়ে তৈরি হয় কেনো

লেপ সবসময়ে লাল কাপড়ে তৈরি হয় কেনো

নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে শীতের আগমন মানেই লেপ-তোষকের বাজারে সরগরম প্রস্তুতি। রংবাহারি ব্ল্যাঙ্কেটের চল যতই বাড়ুক না কেন, বাঙালির শীতে লেপের রয়েছে আলাদা কদর। শীত পড়ার আগেই লেপ ও তোষকের দোকানে ক্রেতাদের ভিড় বাড়তে শুরু করে, আর কারিগর ও ব্যবসায়ীরাও এই সময় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। শীত আসার আগেই দোকান ছেয়ে যায় লাল আভায়।

বাঙালির শীতকালের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত লেপ মানেই যেন তুলায় মোড়ানো লাল কাপড়। লেপ বিছানার অংশ, যা বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, উত্তর ভারত ও নেপালে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। সাধারণত লেপের আবরণ সিল্ক বা মখমলের হয়ে থাকে এবং ভেতরে তুলা থাকে। যা খুব ঠান্ডা আবহাওয়াতেও প্রচুর উষ্ণতা দেয়।

আচ্ছা বলুন তো,লেপে কেন লাল কাপড়ই ব্যবহার করা হয়? আসল কারণ জানলে কিন্তু চমকে উঠবেন!

লেপ-কভারের লাল রঙের পেছনে রয়েছে এক সমৃদ্ধ ইতিহাস। বাংলায় লেপের প্রাচীনত্ব খুঁজে পাওয়া যায় মুর্শিদকুলি খাঁর সময় থেকে, যিনি ছিলেন বাংলার প্রথম নবাব। সেই সময়ে মুর্শিদাবাদ কারুকার্যের জন্য বিখ্যাত ছিল।

লম্বা আঁশের কার্পাস তুলাকে বীজ ছাড়িয়ে লাল রঙে চুবিয়ে শুকিয়ে নরম সিল্ক বা মখমলের কভারে ভরা হত। তখন থেকেই লাল রঙের ঐতিহ্য রূপ নিয়েছে। শুধু তাই নয়, লেপে সুগন্ধের জন্য আতরও দেয়া হতো, যা একসময় লেপকে শুধু উষ্ণ রাখত না, বরং তার মর্যাদা ও সৌন্দর্যও বাড়াত।

তখন বিহারসহ অবিভক্ত বাংলার নবাবরাও এই রীতিটি অনুসরণ করতেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মেয়ের জামাই, নবাব সুজাউদ্দিন, মখমলের পরিবর্তে সিল্ক কাপড় ব্যবহার শুরু করেছিলেন। তবে রঙের কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি-লালই থেকে গেছে।

সময়ের সঙ্গে মখমল ও সিল্কের কাপড় সাধারণ মানুষের জন্য ব্যয়বহুল হয়ে পড়ায়, পরবর্তীতে সাধারণ কাপড় ব্যবহার শুরু হয়। তবু লেপের রং লালই থেকে যায়, যা আজও বাংলাদেশের শীতকালীন লেপের একটি ঐতিহ্যবাহী বৈশিষ্ট্য হিসেবে সমাদৃত।

অনেকের ধারণা, লাল কাপড়ে লেপ মোড়ানোর কারণ শুধুমাত্র ইতিহাস বা ঐতিহ্য নয়; ব্যবসার খাতিরেই ক্রেতার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। দূর থেকে ক্রেতার নজর কাড়তে লাল কাপড় ব্যবহার কার্যকর একটি কৌশল।

এছাড়া, লেপ নিয়মিত ধোয়া সম্ভব নয়। লাল রং সহজে ধুলা, ময়লা বা দাগ ঢেকে দেয়, ফলে লেপ দীর্ঘদিনও অপেক্ষাকৃত পরিষ্কার দেখায়। এটি একটি বড় ব্যবহারিক সুবিধা।

তবে যাই বলা হো্ক না কেন, লাল লেপ কেবল শীতকালীন উষ্ণতার প্রতীক নয় এটি বাঙালির সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যবাহী গল্পের অংশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *